প্রবন্ধ রচনা: আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের তাৎপর্য | JSC, SSC,HSC

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ও এর তাৎপর্য

ভূমিকা:

মাতৃভাষার মাধ্যমে মানুষ মনােভাবের শ্রেষ্ঠ প্রকাশ ঘটায় । জ্ঞানবিজ্ঞান চর্চার যথােপযুক্ত বাহন হল মাতৃভাষা । মায়ের ভাষায় কথা বলার মত এমন পরিতৃপ্তি অন্য কোন ভাবেই সম্ভব নয় । সেজন্য মাতৃভাষাপ্রীতি মানুষের চারিত্রিক মহৎ গুণ হিসেবে বিবেচিত । মাতৃভাষার এ অপরিসীম গুরুত্ব ও অনন্য মর্যাদার বিষয়টি সাম্প্রতিককালে উদ্ভাসিত হয়ে উঠেছে বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলন সম্পর্কিত মহান শহীদ দিবসটি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতির মাধ্যমে ।


প্রস্তাবের উদ্যোক্তা:

ইউনেস্কো কর্তৃক একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালনের যে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে , এর পেছনে কাজ করেছে কানাডার একটি সংগঠন - নাম “ মাদার ল্যাঙ্গুয়েজ লাভার্স অব দ্যা ওয়ার্ল্ড ' । রফিকুল ইসলাম ও আবদুস সালাম নামে দুজন বাঙালি এ সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন । তারা সংগঠনের দশজন বিদেশীকে নিয়ে একুশে ফেব্রুয়ারিকে বিশ্ব মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দানের জন্য প্রথমে জাতিসংঘের মহাসচিবের কাছে আবেদন জানান । বিষয়টি পাঠানাে হয় ইউনেস্কোতে । সেখান থেকে জানানাে হয় কোন সংগঠন নয় সদস্য দেশ থেকে প্রস্তাব যেতে হবে । এ অবস্থার প্রেক্ষিতে বাংলাদেশ থেকে প্রস্তাবটি ইউনেস্কোতে পেশ করা হয় এবং পরিণামে তা গৃহীত হয় ।


একুশে ফেব্রুয়ারি:

একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘােষণার সঙ্গে মহান শহীদ দিবসের তাৎপর্য অনুধাবনের প্রয়ােজনীয়তা বিদ্যমান । তকালীন স্বৈরাচারী শাসনের রাহুগ্রাস থেকে বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষার জন্য রফিক , সালাম , জব্বার , বরকতসহ অনেক বাঙালির রক্তে রঞ্জিত হয়েছিল ঢাকার রাজপথ । মাতৃভাষা বাংলার মর্যাদা আদায়ের সংগ্রাম শুরু হয়েছিল ১৯৪৮ সাল থেকেই । কিন্তু বায়ান্নর একুশে ফেব্রুয়ারিতে তাতে যােগ হয় এক নতুন মাত্রায় । মাতৃভাষার জন্য প্রাণ উৎসর্গ করে বাঙালি জাতি এক নবচেতনার উন্মেষ ঘটায় । এতে বাংলাভাষা দেশের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে এবং সমগ্র বাঙালি জাতিকে স্বাধিনতা আন্দোলনে নিবেদিত হতে উদ্বুদ্ধ করে । একুশের চেতনাই বাঙালিকে স্বাধীনতা সংগ্রামে উপনীত হতে প্রেরণা দিয়েছিল । তাই একুশে ফেব্রুয়ারি বাঙালি জাতির আত্মত্যাগের মহান নিদর্শন আর স্বাধীনতা বাঙালির শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ অর্জন । প্রায় অর্ধ শতকের পর আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে মহান শহীদ দিবস একুশের ফেব্রুয়ারির বিশ্বব্যাপী স্বীকৃতি বাঙালি জাতির সীমাহীন আত্মত্যাগের স্বীকৃতি বাংলা ভাষার মর্যাদার প্রতি বিশ্ববাসীর অকুণ্ঠিত শ্রদ্ধা প্রদর্শন । তাই একুশে ফেব্রুয়ারি আমি কি ভুলিতে পারি- এ বেদনাতুর গানের করুণতম সুর মূচ্ছনা বিশ্বের অধিকার - বঞ্চিত জনগণের প্রভাতফেরিতে যেন অনুরণিত হয়ে উঠছে ।


মাতৃভাষার তাৎপর্য:

একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালনের সিদ্ধান্তের মাধ্যমে বিশ্বের সকল জাতির মাতৃভাষার প্রতি বিশেষ গুরুত্ব আরােপ করা হয়েছে । মাতৃভাষার উন্নয়নের মাধ্যমে জাতীয় সংস্কৃতিকে সমন্নত রাখার মত মহতী উদ্যোগ সকল জাতির জন্যই হয়ে উঠবে পরম কল্যাণকর । মাতৃভাষার মর্যাদার প্রতি এ বিশ্বস্বীকৃতি সকল জাতির মধ্যে পারস্পরিক সমঝােতা বৃদ্ধি করবে । সহনশীলতা ও সহমর্মিতার ভিত্তিতে বিশ্বমানবের সংহতি আরও বৃদ্ধি পাবে বলে প্রত্যাশা করা যায় । ইউনেস্কো অধিবেশনের প্রস্তাবে বলা হয়েছিল , ' মাতৃভাষার উন্নয়ন ও বিস্তারের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হচ্ছে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ঘােষণার মাধ্যমে সদস্য রাষ্ট্রগুলাে ও ইউনেস্কো সদর দফতরে নানা কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে দিবসটি পালন করা । ' বর্তমান বিশ্বে প্রায় আড়াই হাজারের মত ভাষা প্রচলিত থাকলেও অল্প কিছু ভাষা বিশ্বে প্রাধান্য লাভ করে আছে । নিজের মাতৃভাষার মাধ্যমে মনােভাব প্রকাশের সর্বোত্তম উপায় পরিহার করে কয়েকটি নির্দিষ্ট ভাষার ওপর মানুষের নির্ভর করতে হয় । বিদেশী ভাষা শিক্ষা করতে গিয়ে অনেক শ্রম ও সময় ব্যয় করার প্রয়ােজন পড়ে । অনেক ক্ষেত্রে মাতৃভাষা থাকে উপেক্ষিত । অথচ নিজ নিজ মাতৃভাষার মাধ্যমে মানুষ নিজেকে সর্বোত্তমভাবে প্রকাশ করতে পারে , জীবনের বিচিত্র বিকাশ মাতৃভাষাতেই সহজলভ্য । সেজন্য মাতৃভাষার প্রতি গুরুত্ব আরােপ ও তার প্রয়ােজনীয় চর্চার ব্যবস্থা করা আবশ্যক । আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ঘােষণার মাধ্যমে মাতৃভাষার সম্ভাবনার তাৎপর্যই প্রকাশ পেয়েছে।


উপসংহার:

বাঙালি জাতির মহান শহীদ দিবস একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘােষণাদানের ফলে মায়ের ভাষার জন্য বাঙালির আত্মত্যাগ বিশ্বজনের কাছে মর্যাদা লাভ করেছে । বাংলাদেশের মানুষের জন্য , বাংলা ভাষাভাষী সকল মানুষের জন্য তা পরম গৌরবের । মাতৃভাষার জন্য বাঙালির আত্মত্যাগ আজ সারা বিশ্বের মানুষের মধ্যে মাতৃভাষা প্রীতি সঞ্চার করবে - প্রত্যেক দেশের জাতীয় সংস্কৃতিতে আসবে স্বকীয়তার চেতনা । দেশাত্মবােধে উদ্ভুদ্ধ হবে মানুষের মনপ্রাণ ।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ

Do you have any doubts? chat with us on WhatsApp
Hello, How can I help you? ...
Click me to start the chat...